জটিল হচ্ছে ভারতের কৃষক আন্দোলন: দুই পক্ষই অনড়

নিউজ রুমঃ

তিনটি কৃষি আইনকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হওয়া অচলাবস্থা কাটাতে সক্ষম হয়নি মঙ্গলবারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং কৃষক প্রতিনিধিদের মধ্যকার বৈঠক। তবে আন্দোলনরত কৃষকরা বুধবার সিঙ্গু সীমান্তে একটি নতুন বৈঠকে বসতে সম্মত হয়েছেন। বৈঠক শেষ হওয়ার পর সর্বভারতীয় কিষাণ সভার নেতা হান্নান মোল্লা বলেন, কৃষি আইন প্রত্যাহার করার জন্য কেন্দ্র প্রস্তুত নয়। অমিত শাহ কৃষকদের কথা ধৈর্যসহকারে শুনলেও তার বার্তাই ছিল চূড়ান্ত।

তিনটি কৃষি আইনকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হওয়া অচলাবস্থা কাটাতে সক্ষম হয়নি মঙ্গলবারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং কৃষক প্রতিনিধিদের মধ্যকার বৈঠক। তবে আন্দোলনরত কৃষকরা বুধবার সিঙ্গু সীমান্তে একটি নতুন বৈঠকে বসতে সম্মত হয়েছেন।

বৈঠক শেষ হওয়ার পর সর্বভারতীয় কিষাণ সভার নেতা হান্নান মোল্লা বলেন, কৃষি আইন প্রত্যাহার করার জন্য কেন্দ্র প্রস্তুত নয়। অমিত শাহ কৃষকদের কথা ধৈর্যসহকারে শুনলেও তার বার্তাই ছিল চূড়ান্ত।

কৃষক নেতারা জানান, সরকার তাদের প্রস্তাব নির্ধারণ করার পর ডিসেম্বরের ১০ তারিখ পরবর্তী বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে।

 

সরকারের প্রস্তাব অস্পষ্ট!

এদিকে, বুধবার নতুন কৃষি-বিপণন আইন সংশোধন করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের খসড়া প্রস্তাবটিকে “অস্পষ্ট” বলে প্রত্যাখ্যান করেছে কৃষক ইউনিয়নগুলো। তারা আরও বলে যে জয়পুর-দিল্লি এবং দিল্লি-আগ্রা এক্সপ্রেসওয়ে ১২ ডিসেম্বর বা তার আগেই বন্ধ করে দেয়া হবে এবং তাদের দাবি মানা না হলে রাজধানীতে প্রবেশের সকল রাস্তা একের পর এক বন্ধ করা হবে।

এর পরপরই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সাথে পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন কৃষিমন্ত্রী নরেন্দ্র সিং টোমার। কৃষি ইউনিয়নগুলো সরকারের খসড়া প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ে অচলাবস্থার অবসানের সম্ভাব্য উপায় বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে ধারণা করা যায়।

 

আলোচনায় প্রস্তুত সরকার

কৃষিমন্ত্রীর যুগ্ম-সচিব বিবেক আগরওয়ালের প্রেরিত এই প্রস্তাবে সরকার বলে, কৃষকরা নতুন খামার আইন সম্পর্কে যে আপত্তি প্রকাশ করেছেন তা খোলামেলা আলোচনা করার জন্য সরকার প্রস্তুত। এতে বলা হয়, “সরকার কৃষকদের উদ্বেগকে উন্মুক্ত হৃদয়ে এবং দেশের কৃষক সম্প্রদায়ের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বিষয়টি সমাধান করার চেষ্টা করছে। সরকার কিষাণ ইউনিয়নগুলোকে তাদের আন্দোলন সমাপ্ত করার জন্য আবেদন করছে।”

খসড়া প্রস্তাবে অবশ্য আইন বাতিলের জন্য প্রতিবাদী কৃষকদের মূল দাবি সম্পর্কে কিছুই উল্লেখ করা হয়নি। এতে উল্লেখ করা হয়েছে যে তারা কমপক্ষে সাতটি বিষয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে ইচ্ছুক, যার মধ্যে একটি হল মান্ডি ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রক্ষা করতে হবে। কয়েক ঘন্টা পর কৃষক ইউনিয়নগুলো প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং বলে যে তিনটি আইন সম্পূর্ণরূপে বাতিলের দাবি সরকার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তারা তাদের আন্দোলন অব্যহত রাখবে।

নতুন আইন প্রণয়নের পর মান্ডিগুলি দুর্বল হয়ে পড়বে এমন আশঙ্কায় সরকার বলে যে একটি আইন সংশোধন করার মাধ্যমে রাজ্য সরকারগুলো মান্ডিগুলোর বাইরে থাকা ব্যবসায়ীদের নিবন্ধন করতে পারে। কেন্দ্রের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, এপিএমসির মান্ডিগুলো ব্যবহার করায় রাজ্যগুলো কর ও শুল্ক আরোপ করতে পারে।

 

কৃষকদের পক্ষে বিরোধী দলগুলো

এদিকে, সাবেক কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী, এনসিপি প্রধান শরদ পাওয়ার, বামপন্থী নেতা সীতারাম ইয়েচুরি এবং ডি রাজার নেতৃত্বে বিরোধীদলীয় নেতাদের একটি প্রতিনিধি দল বুধবার রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোভিন্দের সাথে সাক্ষাত করেছেন এবং নতুন কৃষি আইন বাতিলের জন্য একটি স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেওয়া এই স্মারকলিপিতে বিরোধীদলীয় নেতারা বলেন, “আমরা ভারতীয় সংবিধানের রক্ষক হিসাবে আপনার সরকারকে ভারতের অন্নদাতাদের দ্বারা উত্থাপিত দাবি মেনে নেয়ার জন্য অনুরোধ করছি। এই নতুন কৃষি আইনগুলো সংসদে একটি কাঠামোগত আলোচনা এবং ভোটদানে বাঁধা প্রদান করে। রাজ্য সরকার পরিচালনাকারী অনেক দলসহ বিশটিরও বেশি রাজনৈতিক দল ভারতীয় কৃষকদের চলমান ঐতিহাসিক সংগ্রামের প্রতি তাদের সংহতি প্রকাশ করেছে এবং গতকাল ভারত বন্ধ আহবানকে আন্তরিকভাবে সমর্থন জানিয়েছে।”

রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাতের পর গণমাধ্যমকে উদ্দেশ্য করে গান্ধী বলেন, সংসদে যেভাবে আইন আইন পাস করা হয়েছে তা ছিল “কৃষকদের প্রতি অবমাননাকর” এবং এ কারণেই তারা “তাদের বিরুদ্ধে এই শীতল আচরণের” প্রতিবাদে বিক্ষোভ করছেন। গান্ধী বলেন, “আমরা রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করে তিনটি কৃষি আইন সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি তাকে জানিয়েছি। আমরা এই আইনগুলো বাতিলের জন্য বলেছি।”

ইয়েচুরি বলেন, “আমরা রাষ্ট্রপতিকে বলেছি যে তিনটি কৃষি আইন গণতান্ত্রিকভাবে সংসদে পাস হয়নি এবং এই আইনগুলো বাতিল করার জন্য আমরা চেষ্টা করছি।”

কৃষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে কেন্দ্রের কৃষি আইনগুলো এমএসপি ব্যবস্থা ভেঙে দেয়ার পথকে প্রশস্ত করবে এবং তাদেরকে বড় কর্পোরেশনের “করুণায়” ফেলে দিয়েছে। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছেন যে নতুন আইনগুলো কৃষকদের আরও ভাল সুযোগ প্রদান করবে। এছাড়াও, বিরোধী দলগুলো কৃষকদের বিভ্রান্ত করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

 

সবচেয়ে উত্তাল পাঞ্জাব ও হরিয়ানা

প্রতিবাদী কৃষক গোষ্ঠীগুলোর ভারত বন্ধ আহবানে পাঞ্জাব এবং হরিয়ানায় সর্বাধিক প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে, যেখানে মঙ্গলবার সকল রাস্তা এবং বাজার বন্ধ ছিল। বেশিরভাগ বিরোধী দল ও ট্রেড ইউনিয়ন সমর্থিত এই অচলাবস্থা ওডিশা, মহারাষ্ট্র এবং বিহারের মতো রাজ্যেও কিছুটা প্রভাব ফেলেছে। সকাল ১১ টা থেকে বিকেল ৩ টা পর্যন্ত চলমান “চাক্কা জ্যাম” বিক্ষোভের সময় কৃষক ইউনিয়নগুলো জাতীয় সড়ক অবরোধ ও টোল প্লাজা দখল করার হুমকি দেয়। বিক্ষোভকারীরা পশ্চিমবঙ্গ, বিহার এবং ওডিশার বেশ কয়েকটি জায়গায় রেলপথও অবরোধ করেছে।

আজাদপুর মান্ডি ছাড়া দিল্লির বেশিরভাগ বাজারই খোলা ছিল। জয়পুরে কংগ্রেস এবং বিজেপি কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। অন্যদিকে, মহারাষ্ট্রে মান্ডিগুলো বন্ধ থাকলেও দোকান খোলা ছিল। পুনে, নাসিক, নাগপুর এবং আওরঙ্গাবাদের মতো বড় শহরগুলির পাইকারি বাজার বন্ধ ছিল। রাজ্যের অনেক জায়গায় খুচরা দোকান এবং কৃষি উত্পাদন বাজার কমিটি (এপিএমসি) বন্ধ ছিল।

পশ্চিমবঙ্গে, যেখানে কংগ্রেস এবং বামপন্থীদের সাথে যোগ দিয়ে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস এই অচলাবস্থাকে সমর্থন জানালেও বাস্তবায়ন করার জন্য কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি, তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল মিশ্র। বেশ কয়েকটি জায়গায় রেলপথ অবরোধ এবং প্রধান রাস্তাগুলোতে বিক্ষোভ অব্যহত ছিল।

বিহারেও ট্রেন-ট্র্যাক, মহাসড়ক এবং অভ্যন্তরীণ রাস্তাগুলো বিক্ষোভকারীরা দখল করার ফলে দৈনিক জীবন বিপর্যস্ত হয়েছে। জেহানাবাদে পাটনা-পালামু এক্সপ্রেসের চলাচল কয়েক মিনিটের জন্য বাধাগ্রস্থ হয়, পরবর্তীতে অবরোধের সমর্থকদের পুলিশ তাড়া করলে তারা সড়ে পড়ে।

কৃষক সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন ও রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মীরা ভুবনেশ্বর, কটক, ভদ্রক এবং বালাসোরের রেলপথগুলোতে অবস্থান নেয়ার ফলে ওডিশার ট্রেন চলাচলেও বাঁধার সৃষ্টি হয়। রাজ্যের অন্যান্য স্থানে বাজার ও অফিস বন্ধ থাকায় এবং কংগ্রেস ও বামপন্থী সমর্থকরা বড় রাস্তাগুলো অবরোধ করলে সাধারণ জীবনযাত্রা ব্যহত হয়। -ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, টাইমস অফ ইন্ডিয়া

শেয়ার করুন-

Leave a Reply