​ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনে অগ্নিসংযোগ, শহরজুড়ে ব্যাপক ভাঙচুর

মতিয়ার রহমানঃ

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ আগমনের প্রতিবাদে ঢাকার বায়তুল মোকারম ও চট্টগ্রামের হাটহাজারিতে মাদ্রাসা ছাত্রদের প্রতিবাদ মিছিলে পুলিশের গুলিতে ১১ জন নিহতের গুজবে শুক্রবার বিকেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তান্ডব চালায় মাদ্রাসার ছাত্ররা।

শুক্রবার বিকেলে স্থানীয় জামিয়া ইসলামিয়া ই্উনুছিয়া মাদ্রাসা থেকে ছাত্রদের একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে শহরে তান্ডব শুরু করে। বিক্ষুব্ধ মাদ্রাসা ছাত্ররা ব্রাহ্মবাড়িয়া রেলস্টেশনের প্যানেল বোর্ডসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র ভাঙচুর করে অগ্নিসংযোগ করলে ঢাকা -চট্টগ্রাম এবং ঢাকা- সিলেট রেলযোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

পরে ছাত্ররা বঙ্গবন্ধু স্কয়ারের জাতির জনকের ম্যুরাল, ছবি ভাঙচুর করে এতে অগ্নিসংযোগ করে । পরে তারা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সামনের বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাঙচুর, পৌর ভবন, পুলিশ সুপারের কার্যালয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানা ঘেরাওসহ বিভিন্ন সরকারি অফিসে ভাঙচুর করে।

এ সময় পুলিশের গুলিতে আশিক (২৫) নামে এক যুবক নিহত হয়েছে বলে শহরে গুজব ছড়িয়ে পরে। তবে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুর রহিম বিষয়টিকে গুজব বলে অবহিত করেছেন।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা আল-মামুন সরকারের দাবি মহান স্বাধীনতা দিবসে এই ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত। তিনি এই ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেন।

মাদ্রাসা ছাত্ররা জানায়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিরোধী বিক্ষোভে পুলিশের গুলিতে ঢাকার বায়তুল মোকাররমের সামনে ৭ জন এবং চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে ৪ জন নিহত হয়েছে এমন খবরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কয়েক হাজার ছাত্র মাদ্রাসা থেকে বেরিয়ে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে রাস্তায় আসে। বিকেল আনুমানিক সাড়ে ৩ টায় হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ মাদ্রাসা ছাত্ররা সমস্ত শহরে তান্ডব শুরু করে। তারা ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলষ্টেশনে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। রেলস্টেশনের ট্রেন চলাচল নিয়ন্ত্রণের প্যানেল বোর্ড ভেঙ্গে চুরমার করে। স্টেশনের সমস্ত আসবাব পত্র রেল লাইনের ওপরে ফেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা স্টেশন সংলগ্ন গেইটকিপারের কক্ষটি ভাঙচুর করে এর দরজা জানালা এবং গ্রিল খুলে ফেলে।

পরে ছাত্ররা বঙ্গবন্ধু স্কয়ারের জাতির জনকের ম্যুরাল ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগসহ সারা শহরের বঙ্গবন্ধুর ছবি সম্বলিত বিলবোর্ড আগুনে পুড়িয়ে দেয়। পরে তারা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, পুলিশ সুপারের কার্যালয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর সভা ভবন, সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ পৌর মিলনায়তনের, বিটিসিএল অফিসে ও শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভাষা চত্বরে হামলা ও ভাঙচুর করে। শহরের বিভিন্ন পয়েন্টের সুবর্ণ জয়ন্তীর জাতির জনকের ছবি সংবলিত বিভিন্ন ফেস্টুন ছিড়ে এর মধ্যে আগুন ধরিয়ে দেয়।

এক পর্যায়ে তারা জেলা শিল্পকলা একাডেমির দরজা জানালার গ্লাস ভাঙচুর করে। মাদ্রাসা ছাত্রদের তান্ডবে গোটা শহরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং পথচারীরা ভয়ে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করে।

এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনের ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ফলে এ রির্পোট লেখা পর্যন্ত ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। ফলে আন্তঃনগর ঢাকাগামী মহানগর এক্সপ্রেস আখাউড়ায় ,সিলেট থেখে ঢাকাগামী জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস আজমপুর স্টেশনে,কর্নফুলী এক্সপ্রেস ব্রাহ্মণবাড়িয়া আউটারে আটকা পড়ে। সন্ধ্যা ৬ টার দিকে মাদরাসার ছাত্ররা রেলস্টেশনে পুনরায় অগ্নিসংযোগ করে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেল স্টেশনের সহকারি স্টেশন মাস্টার মোঃ শোয়েব ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, স্টেশন প্যানেল বোর্ড , সিগন্যাল বোর্ড ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেয় । ফলে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে।

এ ব্যাপারে ব্রাহ্মণবাড়িয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুর রহিম জানান, বিক্ষোভকারীরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানার বাইরে অবস্থান করছে।

এ ব্যাপারে হেফাজতে ইসলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার প্রচার সম্পাদক মুফতি এনামুল হাসান জানান, মোদি বিরোধী বিক্ষোভে ঢাকার বাইতুল মোকাররমে ও হাটহাজারীতে পুলিশ গুলি চালায়। এতে তিন জন ছাত্র নিহত হওয়ার খবরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মাদ্রাসা ছাত্ররা বিক্ষোভ মিছিল করে।

এ ব্যাপারে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মুফতি মুবারক উল্লাহ’র বক্তব্য নেওয়ার জন্য তারা নাম্বারে একাধিকবার ফোন করেও বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

এ বিষয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রইছ উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি পুলিশ সুপারের কার্যালয়সহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে মাদ্রাসা ছাত্ররা হামলা করেছে বলে নিশ্চিত করেছেন।

এ ব্যাপারে ইউনিভার্সিটি অব ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সদর আসনের সংসদ সদস্য র.আ.ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী এমপি বলেন, মাদ্রাসা ছাত্ররা ইউনিভার্সিটি অব ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সামনে স্থাপিত বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাঙচুর ও বাগান তছনছ করেছে।

তিনি বলেন, এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, মহান স্বাধীনতা দিবসে সারা শহরে মাদ্রাসা ছাত্রদের ভাঙচুর ও তান্ডবের ঘটনা তাদের পূর্ব পরিকল্পিত।

এ ব্যাপারে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডাঃ শওকত হোসেন বলেন, সন্ধ্যায় ৬টার সময় আশিক নামে এক যুবককে হাসপাতালে নিয়ে আসে কয়েকজন লোক। কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করলে স্বজনরা তার লাশ নিয়ে যায়। ওই যুবক পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন কিনা জানিনা।

এ ব্যাপারে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুর রহিম বলেন, পুলিশের গুলিতে একজন নিহত হওয়ার খবর সঠিক নয়। এটি একটি গুজব।

শেয়ার করুন-

Leave a Reply